বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ। শিক্ষা,সভ্যতা,সংস্কৃতিতে অনগ্রসর বিস্তীর্ন এ অঞ্চল। শতকরা দুই একজন ছাড়া সবাই নিরক্ষর বললেও অত্যুক্তি হয় না। কুসংস্কার ও নিরক্ষতার অভিশাপে মানুষ যখন অন্ধকারে অতল গহবরে নিমজ্জিত, মানবতা যখন পদদলিত, নিষ্পেষিত, বিচারের বাণী যখন নীরবে নিভৃতে ক্রন্দনরত, জাতি,ধর্ম, বর্ণ ও গোষ্ঠীগত হানা-হানি যখন চরমে,পর্বত প্রমাণ বিভেদ, ঠিক তখনি আলোকবর্তিকা হাতে আবির্ভূত হলেন এতদা অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী নাটোর জেলার বাসুদেব পুর গ্রামের কৃতি সন্তান সূদুর জার্মানী থেকে ডিগ্রী প্রাপ্ত বি,এস,সি ইঞ্জিনিয়ার দানবীর, চিরকুমার শ্রী মহাশয় সঞ্জীব চন্দ্র ভট্টাচার্য। শ্রীশচন্দ্র ছিলেন এই বাসুদেবপুরে ই একজন কৃতি সন্তান। বাসুদেবপুরে সেই ব্রিটিশ রাজত্বকালে গ্রাজুয়েটদের মধ্যে তিনি একজন। সঞ্জীব ভট্টাচার্যের বাবা ছিলেন শ্রীশচন্দ্র। এ অঞ্চলের শিক্ষা,সভ্যতা,সংস্কৃতিতে অনগ্রসর দেখে ছেলেকে বললেন একটা হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করতে হবে । সে সময় বাসুদেবপুর বা অত্র অঞ্চলে কোন হাইস্কুল ছিল না। নাটোর শহরেও একটা মাত্র হাইস্কুল ছিল তা মহারাজার নামে। সঞ্জীব ভট্টাচার্য তার বাবাকে আশ্বস্ত করলেন - তাঁর নামেই স্কুল হবে।তিনি বিদেশ থেকে স্বদেশ তথা বাসুদেব পুরে ফিরে আসা মাত্রই এখানকার সর্ব প্রথম বাসুদেব পুর রেলওয়ে স্টেশনের পশ্চিমে সবুজে ঘেরা ও একটি বড় খেলার মাঠসহ তার নিজস্ব ৭ একর জমির উপর মনোরম পরিবেশে স্থাপন করলেন তার বাবার নামে শ্রীশচন্দ্র বিদ্যানিকেতন। তখন থেকে পথচলা শুরু হল বাসুদেব পুরের এই ঐতিহ্যবাহী হাইস্কুল শ্রীশচন্দ্র বিদ্যানিকেতন বাসুদেব পুর উচ্চ বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় বৃটিশ শাসন অবসানের একেবারেই শেষপ্রান্ত ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারী।
প্রতিষ্ঠার পরেই দ্বিজাতি তত্বে ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে জন্ম নিল দুটি দেশ ভারত ও পাকিস্তান। এ অঞ্চলটি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় শ্রীশচন্দ্র মহাশয় তার একমাত্র পুত্র বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা সঞ্জীব চন্দ্র ভট্টাচার্য্য ও দুই কন্যা মায়া রানী ভট্টাচার্য্য ও ছায়া রানী ভট্টাচার্য্যসহ স্বপরিবারে ভারতে চলে যান এবং যাওয়ায় পূর্বে তাদের যাবতীয় ভূ-সম্পত্তি বিদ্যালয়টির নামে দান করেন।
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দেশত্যাগের পরপরই ১৯৪৮ সালে এক প্রলংকারী কালবৈশাখীর ছোবলে বিদ্যালয়টি বিধ্বস্ত হয়ে যায়। একেতো নব প্রতিষ্ঠিত তার পরে দেশে নেই প্রতিস্থাতা,ফলে বিদ্যালয়টি ঘূর্নিঝড়ের আঘাতে ছেড়াপাল, ভাঙ্গাহাল মাঝি শূণ্য তরীর ন্যায় ভাসতে থাকে অকুল সাগরে।
ইতিহাস স্বাক্ষী এমতাবস্থায় বিদ্যালয়টির পাশে দাঁড়ান রামশার কাজী পুরের কৃতি সন্তান শিক্ষানুরাগী সাবেক ০৫ নং বিপ্রবেলঘরিয়া ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট/ চেয়ারম্যান ডাঃ নাসির উদ্দিন তালুকদার সাহেব। এখানে একটি কথা না বললেই নয় শ্রীশ চন্দ্রের ভাতিজা, বিনয় বাবু ডাঃ নাসির উদ্দিন তালুকদার সাহেবের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তারই সুবাদে নাসির উদ্দিন তালুকদার কাশীনাথ ভট্টাচার্য বধু ঠাকুর সৈয়ম সরদার চকপাড়া, মের্ মৃধা ফজের পরামানিক,কছির উদ্দিন পিয়াদ্ ইলাম উদ্দিন মন্ডল,মানিক মণ্ডল, বিজয় ভট্টাচার্য এরকম এলাকার গন্যমান্য ব্যাক্তিবর্গ স্কুল আবার প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে ছাত্র রাখার /জায়গীর এর ব্যবস্থা করেন। শ্রীশ চন্দ্রের ভাতিজা, বিনয় সহায়তায় এবং উপরিউক্ত ব্যক্তি বর্গের সঙ্গে আলোচনা করে ডাক্তার নাসির উদ্দিন তালুকদার স্কুলে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য সে সময় কলকাতায় যান শ্রীশচন্দ্র বাবু তার শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং শ্রীশচন্দ্র বাবু ও ডাক্তার নাসির উদ্দিন তালুকদারকে খুব স্নেহ করতেন এবং এই স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য আবার চালু করার জন্য তাকে সম্পূর্ণ দায় দায়িত্ব দেয়া হয়, এবং নগদ ছয় হাজার টাকা দিয়ে দেন। ডাক্তার নাসির উদ্দিন তালুকদার সাহেব বাংলাদেশে আসার পর কোলকাতা থেকে পাঠানো হলো এসফল্টের সাথে সিমেন্ট দিয়ে বানানো সহজে নষ্ট হবে না এমন ধরণের আরামিটের ঢেউ ছাদ, শাল কাঠের কড়ি বরগা, দরজা জানালা, চন্দন কাঠের বেঞ্চ, স্থানীয় ভাবে কেনা হলো ইঁট, সিমেন্ট। এটাই চির এবং বাস্তব সত্য ঘটনা এবং পরবর্তীতে ডাক্তার নাসির উদ্দিন তালুকদার শিক্ষকদের বেতনের জন্য তার নিজস্ব ৩৬ বিঘা জমি দান করেন এবং তার সঙ্গে এলাকার গন্যমান্য ব্যাক্তিবর্গকে জমি দান করতে উৎসাহিত করেন। তিনি সভাপতির দায়িত্ব পেলেন।
প্রফুল্ল চৌধুরী, বি,এ হলেন প্রধান শিক্ষক। যাত্রা শুরু হল ইতিহাস খ্যাত শ্রীশচন্দ্র বিদানিকেতনের।
স্কুলের ইমারত নির্মিত হলে বিনয় বাবু এবং ডাঃ নাসির উদ্দিন তালুকদার মিলে শিক্ষক নিয়োগে মনোনিবেশ করেন। সত্য বলতে তাঁদের মনোনীত শিক্ষকরা ছিলেন অসাধারণ পান্ডিত্যের অধিকারী। ডাঃ নাসির উদ্দিন তালুকদার সাহেবের পরিচালনায় তৎকালীন উচ্চ শিক্ষিত যুব সমাজ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে এলাকার শিক্ষার মান বৃদ্ধি করেছিলেন। সেই সম্মানীত শিক্ষক মহোদয় ছিলেন শৈলেন চন্দ্র চক্রবর্তী,মোঃ আশরাফ আলী, শ্রী হরনাথ মৈত্র,মোঃ কাজী আফতাব উদ্দিন এবং মোঃ ইসমাইল হোসেন আকন্দ প্রমুখ।
ডাঃ নাসির উদ্দিন তালুকদার সাহেবের পরিচালনায়/সহযোগিতায় বিদ্যালয়টি আবার ফিরে পেল নব যৌবন। সেই অদ্যবধি বিদ্যালয়টি উত্তরোত্তর উন্নতি লাভ করছে এবং বিদ্যালয়টি থেকে বহু কৃতি শিক্ষার্থী রাষ্টীয় কাজে এবং দেশ-বিদেশে মূল্যবান অবদান রাখছেন।
এখানে উল্লেখ্য যে,নাটোর জেলার নলডাঙ্গা উপজেলার এই বিদ্যালয়টি সব চাইতে পুরাতন ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার ফলাফল বরাবরই অত্যান্ত ভাল।